তাজবির হাসান : চীনের জিংজিয়াং বন্দর থেকে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার প্রগতি’। সোমবার সকাল ১০টায় চীনের জিংজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল বার্থ থেকে প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একটি কোম্পানিকে জাহাজটি দৈনিক ২০ হাজার ডলারে ভাড়া দেয়া হয়েছে। বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, ‘বৃহস্পতিবার চীনের ইয়ার্ড থেকে জাহাজটি বুঝে নিয়েছি আমরা। বুঝে নেয়ার পরপরই নতুন এই জাহাজ বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়া হয়েছে। ভাড়া বাবদ প্রতিদিন ২০ হাজার মার্কিন ডলার পাবে বিএসসি। ‘বাংলার প্রগতি’ জাহাজটি চীনের জিংজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল বার্থ থেকে যাত্রা করেছে।’
সূত্র জানায়, ১৯৯ মিটার লম্বা, ৩৩ মিটার প্রস্থ, ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজটি ৬৫ হাজার টন পণ্য পরিবহনে সক্ষম। জাহাজটির প্রধান ইঞ্জিন গঅঘ-ই্ড (জার্মান লাইসেন্সের অধীনে নির্মিত, চীন সংযোজিত)। পাম্প স্পেনের এবং কম্প্রেসার নরওয়ের। বিএসসি’র নিজস্ব অর্থায়নে ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার ডিডব্লিউটি ক্ষমতাসম্পন্ন বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সুপারিশ সদয় অনুমোদনের প্রেক্ষিতে গত ২১শে সেপ্টেম্বর বিএসসি ও সরবরাহকারী/বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি’র মধ্যে সরবরাহ চুক্তি হয়। নৌ- পরিবহন মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত মেয়াদকালে বাস্তবায়নের জন্য এর ডিপিপি গত ৩রা জুন অনুমোদিত হয় এবং ৪ঠা জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। চুক্তি মোতাবেক প্রতিটি জাহাজের মূল্য ৩৮ দশমিক ৩৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দুটি জাহাজের মোট সমন্বয়কৃত ও সুপারিশকৃত মূল্য ৭৬ দশমিক ৬৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ কম। জাহাজগুলো কেনার ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা প্রস্তাবে গৃহীত বিভিন্ন কারিগরি দিক যাচাই-বাছাই করা হয় এবং মূল্যায়ন কমিটি সরজমিন জাহাজের নির্মাণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। জাহাজের স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত এবং কারিগরি মূল্যায়নে ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির প্রতিনিধির বিশেষজ্ঞ সেবা নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রাপ্তির পর জাহাজগুলোর নাম পরিবর্তন করে এমভি বাংলার প্রগতি (আগের নাম: XCL GEMINI) ও এমভি বাংলার নবযাত্রা (আগের নাম: XCL LION) নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অনুযায়ী, যেকোনো দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ দেশীয় ক্যারিয়ার, ৪০ শতাংশ বিদেশি ক্যারিয়ার এবং বাকি ২০ শতাংশ দেশি ও বিদেশি ক্যারিয়ার যৌথভাবে পরিচালনা করে। বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০২টি জাহাজ দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র ১১ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। সামুদ্রিক নৌ-বাণিজ্যে জাহাজ থেকে আয়ের অপার সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ যত বাড়বে, দেশের নাবিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বৃদ্ধি পাবে। নাবিকদের বেতনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। আবার এসব জাহাজ অন্যান্য দেশের পণ্য পরিবহন করেও ভাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রয়েছে।সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) জাহাজ ভাড়ার মাধ্যমে ২৮৯ কোটি ৫০ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করেছে। বিএসসি’র কোনো জাহাজ দেশে চলাচল করে না। এগুলো বিশ্বের এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যাতায়াত করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিএসসি’র বহরে একসময় ৪৪টি জাহাজ ছিল। কিন্তু নানামুখী অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় বিএসসি লোকসান দিতে দিতে একেবারে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। একপর্যায়ে ২০১৮ সালে এসে সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসে। পরে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনটি এবং ২০১৯ সালে তিনটি মিলে ছয়টি জাহাজ নিয়ে বিএসসি’র বহর উন্নীত হয় আটটি জাহাজে। ২০২২ সালের ২রা মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে বিএসসি’র বহর আবার সাতটি জাহাজে নেমে আসে। গত বছর অক্টোবরে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৭ বছরের পুরনো ‘এমটি বাংলার সৌরভ’ ও ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ জাহাজ দুটি অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে পরবর্তীকালে ৫৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়া হলে বিএসসিতে জাহাজের বহর নেমে আসে পাঁচটিতে




